আমাদের শান্তিনিকেতন

“সান্দাক্‌ফু”

“না, না, মেঘাতাবুরু, স্যার তো বললেন”

“সেটা কোথায়ে আবার? ও রাঁচি, এই ইস্‌। মরতেও কেউ বিহার এ যাবেনা। ওই তো পাগ্লাগারদ আর বড্ড গরম।”

“সান্দাক্‌ফুই যাওয়া যাক। ট্রেক ও করা যাবে। মজা হবে কিন্তু! বরফ ও দেখতে পাব, থান্দার মধ্যে ইয়ে টাও ভাল জমবে।”

‘দেখ, জানুয়ারিতে সান্দাকফু যদি প্লান করে না পৌঁছতে পারি, তাহলে কিন্তু বিপদ, ওই মানেভাঞ্জঙ্গেই থেকে যেতে হবে। কৌস্তভের আবার মাথা ঘোরে। কিছু হয়ে গেলে?’


কয়েকদিন পর…

“শোন, শান্তিনিকেতন যাই। আড্ডাই তো দেব, আর স্যারদের সাথে ঘুরতে যাওয়াটাই তো প্রায়োরিটি। অনেকেই, শান্তিনিকেতন যায়েনি আমাদের মধ্যে। গরম ও থাকবে না ফেব্রুয়ারি তে, ভালই হবে।”

“খাব, আড্ডা দেব, খাব, ব্যাস্‌!”

2

শান্তিনিকেতন আমার খুব প্রিয় একটা শহর। ঠিক শহর বলাও যায়ে না আবার, আবার গ্রামও না, মফস্বল ও না। শান্তিনিকেতন বলতে যা বোঝায়ে, জায়েগাটা ঠিক তাই। উড়নচণ্ডী মনকে শান্ত করার আদর্শ স্থান। হস্টেলে থাকা নিরীহ কয়েকটা প্রান ও তাদের অর্থনীতি শাস্ত্রের গুরুকুল এর গুরু-রা মিলে চললুম বোলপুর।

5

 

শৃঙ্খলতার বাঁধন ছেড়ে বিশৃঙ্খলতার দূত হব তিনটে দিন। প্রান ভরে পর নিন্দা পর চর্চা, ভাল খাওয়া দাওয়া, ভাল সঙ্গ আর তিন বছরের সব স্মৃতি আঁকড়ে রেখে নতুন স্মৃতি তৈরি করা, এই তো কয়েকটা কাজ এই তিনদিন। শান্তিনিকেতন নিজেই ছন্দবিহিন ছন্দে মেতে উঠতে বলেছে। জীবনের তাল লয়ে মেনে জীবনসঙ্গীত রটতে বলেছে। তাই যতই মিশনে তিন বছর কাটাই না কেন, যতই নিজ ইচ্ছে ছাড়া খন্দনভবঃ করিনা কেন, শৃঙ্খলতার আদর্শ বিবেকানন্দের আগে কবিগুরুই শিখিয়েছেন।

বতদু1

 

ট্রেনে বসে তখনও একজন ইকোনমিক্সের কথা ভুলতে পারেনি, হাল্কা ধমকে থামল। এরপর নৈহাটি অবধি প্রিন্সটন আর স্ট্যানফোর্ডের ডিগ্রি নিয়ে কেচ্ছা শুনে কাটল, শুনলাম ফিজিক্‌সে ফেল করে ন্যানোটেকনোলজিতে পিএইচডির গল্প। নৈহাটিতে গাড়ি দাড়াতেই, ট্রেন জার্নির দ্বিতীয় পর্ব শুরু হল। হাসির খোরাকের লোক এতক্ষণ আমাদের সাথে ছিল না, ট্রেনে উঠেই কিছু একটা বলতেই সবাই হেসে উঠলাম, আমি বাদে, শুধু দেখলাম ভাস্কর স্যার ব্যাগটা হাতছাড়া করল না। সন্দেহের ব্যাপার।

“স্যার খাবেন?”

“একটু পরে, সকাল সকাল দুধ কলা রুটি খেয়ে বেরিয়েছি বুঝলে তো, আর তেমন ওষুধও আনিনি, মাঝরাস্তায়ে কিছু হলে বিপদ।”

Kaustav
ক্লান্ত কৌস্তভ

এইদিকে প্রফেসরদের না দিয়ে আমরাও খেতে পারছিনা। আমি তো সকালে কিছু খাইনি, পেটে সব পশুপাখি দৌড়চ্ছে। কে খেয়ে আস্তে বলেছিল দুধ কলা রুটি?

“এই বুঝলে এবার খেতে দিতে পার, খেতে খেতেই পৌঁছে যাব।”

১১ জনের অপর খাবারের দায়িত্ব, তিন জন এনেছে কচুরি, তিন জন আলুর দম, দু জন মিষ্টি একজন প্লেট – গ্লাস – চামচ, বাদবাকি আর মনে নেই। খাওয়া শেষ করে মুখ তুলতেই দেখলাম ট্রেনের সবাই জুলজুল চোখ করে তাকিয়ে রয়েছে, সত্যি এত সুন্দর গন্ধ আর এত সুস্বাদু খাওয়ারের ওপর থেকে কার নজর/মন সড়ে।

Dog and Shadows

খাওয়া পর্বের পর ট্রেন থেকে নেমে অটো ধরতে যাব, ভাস্কর স্যার বলে উঠলেন “নতুন নাকি এখানে, কি ভেবেছ, ২৫ টাকা ভাড়া, ১০ টাকার বেশি এক পয়েসাও দেব না। যেতে হলে চল নয়ে তো… এই দেখ তো অন্য কোন অটো বা রিক্সা আছে কি না?”

অটো ড্রাইভারের নাম আশিক। আমাদের থেকে বড়োজোর ৫ বছরের বড়ো, বিয়ে সেরে ফেলেছে, দেখেই মনে হল বড্ড চ্যাঙরা, আমাদের পছন্দসই। একটু বোতল-এর কথা শুনতে পেয়েই বলল, এই দেখ, এখানে পাবে, স্টেশনের কাছে একটা দোকান আছে, আর ওই পূর্বপল্লীর কাছে বাজারে দোকান আছে, চিন্তা করনা, পেয়ে যাবে। উৎফুল্ল চিত্তে, ফুর্তির প্রান গড়ের মাঠ নিয়ে আশিকের ফোন নাম্বার নিয়ে নিলাম।

road to somewhere
পথ চলিতে, যদি চকিতে, কভু দেখা হয়ে

শনিবার ছিলনা, তাই শনিবারের হাট ও নেই সেদিন। গেস্ট হাউসেই খেয়ে আমরা বেরলাম বিশ্ব ভারতীর দিকে। মিউজিয়াম আর পাঁচটা বাড়ি দেখব। এসেছিলাম ১০-১১ বছর আগে, অনেক পাল্টেছে, আবার অনেকটাই এক আছে। মিউজিয়াম নতুন করে সাজিয়েছে, শীততাপনিয়ন্ত্রিত আর গান বাজছে।

3

অদ্ভুত ভাবে অনেকেই রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে অবগত নয়ে। মিউজিয়ামে ঢুকে গুরুদেবের ব্যবহৃত আসবাবপত্র দেখতে দেখতে, নতুন এক ঘোরে ঢুকলাম। নোবেলের রেপ্লিকা রাখা ও অনেক অনেক কবিতা গান দেয়ালে টাঙ্গানো। হলদে আলো আর খয়েরী পাতার ছোঁয়ায় আলাদা একটা জগত। সুশোভন আর আমি ঘরে ঢুকে ঘুরছি, বঙ্গ মায়ের বং সন্তানকে একটু একটু করে জ্ঞান দিচ্ছি; সময়ে যে লাগামছাড়া গরুর মত পালিয়েছে মনেই নেই। বেরতেই শুনলাম, কেউ একজন নাকি অনেকজনকে খুব বকেছে। ব্যাগ-সঙ্ক্রান্ত উক্ত ব্যাক্তির কাজ বোঝা গেল। তাকে একটু শান্ত করে আমরা পৌঁছলাম রায়পুর রাজবাড়ী; রাজবাড়ীর ভগ্নাবশেষও বলা যায়ে। কলাভবন ঘুরে, ছাতিম তলা হয়ে ফেরার পথে একটা সাইকেল-কাকুকে থামালাম। ঝোলানো ব্যাগে আমাদের মনের জিনিস- রাবড়ি। সন্ধ্যের  ব্যবসা সাঙ্গ করে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে আমরাও বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

Humpty Sharma
উপাসনা ও হাম্পটি হালদার

 

ঘরের দরজার এপার আর ওপারে এক আকাশপাতাল পার্থক্য ছিল আমাদের। মানে ওই বাঁধন বিহীন আপন প্রান আর কলেজের ভদ্র ছেলে। দরজা বন্ধ করতেই নিজ মূর্তি ধারন করে আড্ডা। মজলিশ একটু পরে, রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর। আমরা পাঁচজন আড্ডা দিয়ে, ফুর্তি করে শুতে গেলাম যখন তখন ৪টে বাজে। সকাল সাড়ে ৮টায়ে আবার বেরতে হবে। সবাই রেডি যখন, একজন লাপাতা। টোটোতে সবাই দাড়িয়ে বসে, ৯টা বাজে, শ্রেয়ান তখনও বাথরুমে, পেট খারাপ; ট্রেন থেকে নামবার সময়েও এক কীর্তি করেছিল।

Sushobhan Sushovan
সুশোভন ও সুশোভন 

গন্তব্যস্থলের মধ্যে ছিল আমার কুটির, কোপাই নদী, আর দুপুরে বনলক্ষ্মীর খাওয়া। অভিষেক শান্তিনিকেতন আসার একমাস আগে থেকে লোভ দেখিয়েছে এখানের। পাতে যখন গরম ভাতে ওই ঘি পরল, মন প্রান জুরিয়ে গেল। গন্ধে চারিদিক ভেসে গেছে, এ যেন এক অন্য জগত! এরপর ঝুরো আলুভাজা সহযোগে মুসুরির ডাল, ধোকার দালনা, মাছের কালিয়া, মাংস, চাটনি, দই আর শেষ পাতে ছানার পায়েস।

4

নড়তে পারছিনা, এমতাবস্থায়ে ঘরে ফিরলাম।

এখনও আমাদের কাছে বাঞ্ছারামের লাড্ডু পরে আছে, সেটারও সদ্গতি করতে হবে। অনেকের থেকে অভয়বাণী পেলাম।  রাত্রে খেয়ে উঠে, দাঁত খুঁচিয়ে স্যারদের সাথে গল্প; ট্যুরের হাইলাইট।

চারমাস আগে কি আড্ডা দিয়েছিলাম সত্যি মনে নেই, তবে আমাদের মাননীয় স্ট্যানফোর্ডের ছাত্র, যার হাতে ছড়ি, তাকে নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। সেই প্রসঙ্গে না যাওয়া ভাল এখন। কলেজ পাশ করে গেছি। এখন গ্র্যাজুয়েট, তবে ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট এখন হাতে পাইনি। ডিফেমেশন কেস্‌ ঠুকলে ভবিষ্যতের নাম খগেন হয়ে যাবে; তাই তিন বছর কাটিয়ে এখন Forgive and Forget.

Bouganvillea

রাত গড়িয়ে মধ্যরাত, আমাদের তখন “The Night is still young” Mood.  হাম্পটি হালদার, মাইতি, সায়ন্তন; তিনজন বেশি আমাদের ঘরে। দিনের শেষে যে যার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে পরেছে। সেরকম কিছুই ছিলনা, তবে যাই ছিল তাই অনেক। শুকনো, তরল, বাষ্পীয় সব। মাইতি তো বলেই ফেলল, “আহা, রাশিয়ান হলে মন্দ হত না, বলতেই পারতিস, টাকা দিয়ে দিতাম।” হাম্পটি হালদার বাড়ি থেকে পারমিশান নিয়ে এসেছেন। সব কিছুর শেষে তিনি বললেন, “না এইসব ঘন ঘন করা যাবেনা। আবার চার মাস পরে।” কলকাতাতে ফিরে এসে প্রথম দিন বলল, “আরেকবার হবে নাকি?” আরও অনেক কিছু ঘটেছে সেই রাতে (বাজে চিন্তা মাথায়ে আনার কোন মানে নেই), হাসি ঠাট্টা আনন্দ করতে করতে ঘুম। এরই মধ্যে হঠাৎ মনে হয়েছিল আবার কবে হবে এইসব। আর হবে না। দুজন চেন্নাই চলে গেল, একজন যথাসম্ভব বিদেশ যাবে, আমি কলকাতাতেই। তবুও হয়ে উঠবেনা কারুরই।

Sayanto Karfa
সায়ন্ত

তিনবছরে অনেক কিছু করেছি, অনেক কিছু শিখেছি, নিজের ব্যাচমেটদের সাথেও অনেক মনমালিন্য হয়েছে। আমি ঠোঁটকাটা, তাই অনেককে বেমতলব যখন যা মনে হয়েছে বলেছি। তবে কেউ সেই নিয়ে কিছু বলেনি, বরং আমি নিজেকে সংযত করেছি। তিনবছর অনেকটা সময়ে, অনেক কিছু করা যায়ে, অনেক পাওয়া যায়ে, অনেক হারানো যায়ে। আমিও অনেক বন্ধু পেয়েছি, ভাল প্রোফেসর পেয়েছি; সর্বোপরি পাওনা হল স্মৃতি, যেটাকে কেউ ভাঙতে পারবেনা, কেড়ে নিতে পারবে না। পুরোটাই আমার একার।

Gp

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s